খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:৪৬ পিএম
বাংলাদেশ নামক এই বদ্বীপের ঠিক মাঝখানটায় চোখ রাখলে রূপালী নদী আর সবুজের মেলবন্ধনে ঘেরা একটি অঞ্চল নজর কাড়ে। এটিই আমাদের ঐতিহ্যবাহী পাবনা জেলা। দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজশাহী বিভাগের দক্ষিণ-পূর্ব কোণ জুড়ে এই জেলার অবস্থান। উপজেলার সংখ্যা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পাবনাকে বাংলাদেশের একটি ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত জেলা হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। শান্ত ইছামতি নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই জনপদটি যেমন তার হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত, তেমনই বর্তমান সময়ে দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত হাব হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছে। চলুন, কোনো ছক বা কৃত্রিমতার বাইরে গিয়ে, একদম মানচিত্রের পাতার গভীরে ডুব দিয়ে পাবনা জেলার সীমানা ও রূপরেখাটি চিনে নেওয়া যাক।
মানচিত্রের নিখুঁত স্কেলে পাবনা জেলাটি বাংলাদেশের উত্তর-বঙ্গ এবং রাজশাহী বিভাগের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক অনুযায়ী, এই জেলাটি ২৩°৪৮′ থেকে ২৪°৪৭′ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯°০২′ থেকে ৮৯°৫০′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। ভৌগোলিকভাবে এটি বাংলাদেশের ঠিক মধ্যভাগে অবস্থান করলেও, নদী অববাহিকা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে একে উত্তরবঙ্গের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
পাবনা জেলার মানচিত্রটি মূলত প্রাকৃতিকভাবেই বিভিন্ন বড় বড় নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং সুরক্ষিত। এর চারপাশের সীমানা লক্ষ্য করলে দেখা যায় নদী কীভাবে এই জেলার রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছে:
উত্তরে: পাবনার উত্তর দিকটি জুড়ে জড়িয়ে আছে সিরাজগঞ্জ জেলা।
দক্ষিণে: প্রমত্তা পদ্মা নদী পাবনার দক্ষিণ সীমানা নির্ধারণ করেছে। এই রাজকীয় নদীটি পাবনাকে ওপারে থাকা রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়া জেলা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করে রেখেছে।
পূর্বে: পাবনার পূর্ব প্রান্ত দিয়ে বয়ে গেছে এ দেশের অন্যতম প্রধান নদী যমুনা। এই যমুনা নদীই মূলত পূর্বদিকের সীমানা প্রাচীর হিসেবে কাজ করছে।
পশ্চিমে: পাবনার ঠিক পশ্চিম সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থান করছে নাটোর জেলা।
পাবনার মানচিত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ঐতিহাসিক মিলনস্থলটি রয়েছে এর আমিনপুর থানায়। এই থানার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে এসে বাংলাদেশের দুই প্রধান নদী—পদ্মা ও যমুনা—একে অপরের বুকে আছড়ে পড়েছে এবং মিলিত স্রোতধারা হিসেবে এগিয়ে গেছে।
পাবনার মানচিত্র ধরে যদি আপনি এর ভেতরে প্রবেশ করেন, তবে প্রতিটি উপজেলাতেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে একেকটি জাতীয় ঐতিহাসিক নিদর্শন ও মেগা প্রজেক্ট।
মানচিত্রের ঠিক পশ্চিমাংশে অবস্থিত ঈশ্বরদী উপজেলা। এই এক উপজেলাতেই রয়েছে দেশের যোগাযোগ ও প্রযুক্তির দুই সেরা বিস্ময়। প্রথমটি হলো ব্রিটিশ আমলে তৈরি ঐতিহাসিক রেলসেতু ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’, যা পদ্মা নদীর ওপর এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক এর পাশেই সড়ক যোগাযোগের জন্য নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ‘লালন শাহ সেতু’। আর একটু এগোলেই পদ্মার কোল ঘেঁষে দেখা মিলবে বাংলাদেশের স্বপ্নের ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেগা প্রজেক্ট ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’—যা পুরো দেশের জ্বালানি খাতের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে।
শিক্ষা ও চিকিৎসার দিক থেকেও পাবনার মানচিত্র অত্যন্ত সমৃদ্ধ। জেলার প্রাণকেন্দ্রে গেলেই দেখা মিলবে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাস্ট), ঐতিহ্যবাহী সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ, পাবনা ক্যাডেট কলেজ এবং পাবনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মতো নামকরা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এছাড়া দেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকা অনন্য স্থাপত্যের ‘পাবনা সরকারি মানসিক হাসপাতাল’ এই জেলা শহরটিকে চিকিৎসাক্ষেত্রে এক আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।
সহজ কথায়, পাবনা জেলার মানচিত্রটি কেবল কিছু রেখা আর সীমানার গল্প নয়; এটি নদী-বিধৌত এক উর্বর পললভূমি, বীরত্বের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের আধুনিক অগ্রযাত্রার এক জীবন্ত ক্যানভাস।

মন্তব্য