ভালো নেই সঙ্কটে জর্জরিত পাবনা মানসিক হাসপাতাল

দেশের মানসিক রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে পুরোনো প্রতিষ্ঠান পাবনা মানসিক হাসপাতাল নিজেই ভালো নেই। ২৮ বছরেও বাড়েনি শয্যা সংখ্যা। ছয় দশক আগে নির্মিত জরাজীর্ণ ভবনেই চলছে রোগীদের চিকিৎসা। চিকিৎসার মান ও হাসপাতালের সুযোগ সুবিধা নিয়ে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ।

 

ভালো নেই সঙ্কটে জর্জরিত পাবনা মানসিক হাসপাতাল

 

সংকটের কথা স্বীকার করে পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ আশ্বস্ত করেছেন হাসপাতালের অবকাঠামোসহ চিকিৎসক সংকট আর সেবার মান বাড়াতে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

প্রতিষ্ঠানটির বেহাল প্রবেশ পথ দেখেই বোঝা যায় পাবনার মানসিক হাসপাতাল ভালো নেই। যত ভেতরে যাওয়া যায় ততই এর সত্যতা মেলে। মূল ভবন থেকে বহির্বিভাগের ভবনের অবস্থা নাজুক। হাসপাতালে প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও ২৮ বছরে বাড়েনি শয্যা সংখ্যা। ৩৫০টি সাধারণ শয্যা পরিপূর্ণ আর ১৫০টি পেয়িং কেবিনে ভর্তি আছে প্রায় একশ’ জন রোগী। বর্তমানে পরিচালকসহ এই হাসপাতালে চিকিৎসক রয়েছেন ১৪ জন। চিকিৎসক স্বল্পতা রয়েছে ১০ জন।

 

 

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানসিক রোগীকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে আসছেন স্বজনরা। বহির্বিভাগে চিকিৎসক দেখিয়ে বেশিরভাগ রোগীকেই চলে যেতে হচ্ছে। হাসপাতালে পুরুষদের জন্য ১৪টি ও নারীদের জন্য ৫টি ওয়ার্ড রয়েছে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের খাবারের মান ভালো না।

মান নষ্ট হয়েছে দাবি করে হাসপাতালে নতুন ভবন নির্মাণসহ সেবার মান বৃদ্ধির জন্য হাসপাতালের বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি তুলেছেন এলাকার লোকজন। রোগীদের স্বজনদের বেশিরভাগের মানসিকতাই বেদনাদায়ক জানিয়ে মানসিকতা বদলের আবেদন রেখেছেন হাসপাতালের সেবিকারা।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, স্থানীয় রোগীদের জন্য সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডাক্তার দেখানোর সময় ঠিক থাকলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীদের জন্য এই সময়সূচি পরিবর্তন করা জরুরি। রোগী দেখানোর সময় বেলা ৩টা পর্যন্ত করার দাবি তাদের।

তারা আরও বলেছেন, ওষুধের সাথে বিনোদন ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করাও জরুরি। বর্তমানে শারীরিক বা মানসিক কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হলে রোগীকে নিয়ে শহরে যেতে হয়। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠান মানসিক রোগীদের পরীক্ষা করতে চায় না।

এখানে রোগীদের জন্য ভালো বসার ব্যবস্থা নেই। সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে সব জায়গায় দালাল চক্র সবসময় সাধারণ রোগীর স্বজনদের হয়রানি করে। অনেক সময় দালালের খপ্পরে পড়ে রোগীকে বেসরকারি ক্লিনিকে অনেক বেশি খরচে ভর্তি করতে হয়। অন্য হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নেয় দালালচক্র।

google news
গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

পাবনা মানসিক হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, পাবনা মানসিক হাসপাতালে অনেক সংকট রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম চিকিৎসক ও লোকবল সংকট। এখানে চিকিৎসকসহ লোকবল নিয়োগ হলে সমস্যার অনেকাংশেই সমাধান হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, এই হাসপাতালের সংকট নিরসনে সরকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। নতুন মহাপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বহির্বিভাগের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ। পুরোনো জরাজীর্ণ ভবন আর থাকবে না। রোগীদের থাকার জন্যও আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে।

হাসপাতালে অনেক রোগী অভিভাবকহীন অবস্থায় আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতে ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে অনেকেই রোগী ভর্তি করিয়ে চলে গেছেন। পরে আর কোনো খোঁজ রাখেননি। অবশ্য ২০২২ সালের পরে এ ধরনের আর কোনো রোগী এখানে ভর্তি হয়নি। কারণ আমরা জাতীয় পরিচয়পত্র নিশ্চিত হয়ে রোগী ভর্তি করছি।

২০১৪ ও ২০১৫ সালে ভর্তি হওয়া অভিভাবকহীন ২৪ জন রোগী আছেন। রোগীর স্বজনদের দেওয়া ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে তাদের পাওয়া যায়নি। তাই এই ২৪ জন রোগী বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।

ডা. শাফকাত আরও বলেন, হাইপোথেরাপি বা মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা এখানে খুবই সীমিত। মানসিক রোগীরা অনেকটা ডায়াবেটিক রোগীদের মতো। সব সময় রোগ নিয়ন্ত্রণে সচেতন থাকতে হয়। তাদের মুখে তুলে ওষুধ খাওয়াতে হয়। এক মাস পরপর মানসিক চিকিৎসক দিয়ে নিয়মিত দেখাতে হয়।

তিনি মনে করেন, হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির দরকার আছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রাংশ একসাথে না হলেও পর্যায়ক্রমে সরবরাহের ব্যবস্থা যদি সরকার করে তাহলে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বহির্বিভাগে ১০ টাকায় কাটা টিকিটে রোগী দেখেন চিকিৎসকরা। তবে আধুনিক এই যুগেও সেই পুরোনো পদ্ধতিতেই চিকিৎসা চলছে এখানে। এখানে নেই কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা। জরাজীর্ণ ভবনের সামনে গাদাগাদি করেই চিকিৎসক দেখাতে হচ্ছে।

 

 

পাবনা শহরতলির হেমায়েতপুরে ১৯৫৭ সালে প্রায় ১১২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় পাবনা মানসিক হাসপাতাল। মানসিক রোগীর জন্য নির্মিত এই বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণকালে এর শয্যাসংখ্যা ছিল প্রথমে ১৫০। পরে সেটি ২০০ করা হয়। এরপর ১৯৯৬ সালে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।

তবে হাসপাতালে প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও প্রায় তিন দশক হতে চলা এই হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা আর বাড়ানো হয়নি। দেশের জনসংখ্যার সঙ্গে মানসিক রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও এই বিশেষায়িত হাসপাতালের শয্যাসংখ্যার সাথে চিকিৎসাব্যবস্থা চলছে সেই পুরোনো নিয়মেই।

 

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment